সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সম্পদ

সম্পূর্ণ পড়ুন প্লীজ। । ।

মানুষ তার রবের অনুগ্রহ স্বীকার করে না —আল-আদিয়াত

শপথ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা অশ্ববাহিনীর। যাদের ক্ষুরের আঘাতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে। যারা ভোর বেলা আক্রমণ করে, ধুলোর মেঘ উড়িয়ে। তারপর তারা শত্রুদলের একদম ভেতরে ঢুকে পড়ে…।
মানুষ তার রবের অনুগ্রহ স্বীকার করে না। এরা নিজেরা তা ভালো করেই জানে। বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতি এদের চরম মোহ।
এরা কি জানে না, যেদিন কবরগুলোর ভেতর থেকে সব বের করে ফেলা হবে? এদের অন্তরে কী আছে সব প্রকাশ করা হবে? সেদিন তারা দেখবে তাদের রব তাদের সম্পর্কে সবই জানেন। —আল-আদিয়াত

মানুষ তার রবের অনুগ্রহ স্বীকার করে না।
মানে? কোথা থেকে কী হলো? সেই ঘোড়া বাহিনীর কী হলো? কে জিতলো?

আল্লাহ تعالى বলছেন মানুষ হচ্ছে كنود কানুদ। কানুদ হচ্ছে এমন একজন, যার জন্য ভালো কিছু করা হলেও সে তা স্বীকার করে না। এরা সারাদিন বসে শুধু হিসেব করে তার কত অভাব, কত দুঃখ, কত কিছু পাওয়া হলো না। কিন্তু সে জীবনে কত ভালো কিছু পেয়েছে, সেগুলো নিয়ে ভেবে দেখে না।

— আল্লাহ تعالى বলছেন, মানুষ অবশ্যই একেকটা কানুদ। এদেরকে তিনি تعالى অনেক দিয়েছেন। কিন্তু জীবনে যা পেয়েছে তা নিয়ে কৃতজ্ঞতা না দেখিয়ে সবসময় চিন্তা করে সে কী পায়নি, আরও কত কিছু সে পেতে পারত।

ঘোড়ার উদাহরণ কেন দেওয়া হলো তা ভেবে দেখা দরকার। ঘোড়াকে একটু খাবার দিলে এবং যত্ন করলেই সে তার পালকের একান্ত অনুগত হয়ে যায়। এই বিশাল দেহী অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাণীটা তার থেকে অনেক দুর্বল মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে অনুগত হয়ে চলে। তার পালক যদি তাকে যুদ্ধের মতো ভয়াবহ জায়গায়ও নিয়ে যায়, সেখানেও সে একান্ত বাধ্য অনুগতের মতো নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালকের নির্দেশ মেনে চলে। তাকে তীর মারা হোক, বর্শা দিয়ে আঘাত করা হোক না কেন, সে কখনই পালককে ফেলে নিজের জানের ভয়ে পালিয়ে যায় না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে তার প্রভুর নির্দেশ পালন করে। কৃতজ্ঞতা এবং আনুগত্য কীভাবে দেখাতে হয়, ঘোড়ার কাছ থেকে তা আমাদের শেখার আছে।  কিন্তু আফসোস, মানুষ তার রবের প্রতি সামান্যও কৃতজ্ঞতা দেখায় না। তার রবের নির্দেশ মানতে জীবন দেওয়া তো দূরের কথা, একটু কষ্ট করে ভোরে উঠে অজু করে ফজরের নামাজটাও পড়তে পারে না।

অনেক বছর আগে আল্লাহ تعالى যখন ইবলিসকে তাঁর সান্নিধ্য থেকে বের করে দিচ্ছিলেন, তখন ইবলিস একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শপথ করেছিল, যা থেকে তার মানুষকে ধ্বংস করার অন্যতম একটি প্রধান পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়—

(ইবলিস বলল) “আমি মানুষের কাছে আসবো: ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই কৃতজ্ঞ না।” [আ’রাফ ৭:১৭]

মনে করে দেখো, তোমাদের প্রভু কথা দিয়েছিলেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি তোমাদেরকে আরও দিতেই থাকবো। কিন্তু তোমরা যদি অকৃতজ্ঞ হও… আমার শাস্তি প্রচণ্ড কষ্টের।” [ইব্রাহিম ১৪:৭]
এরা নিজেরা তা ভালো করেই জানে

মানুষ যে কানুদ, তার প্রমাণ বের করার জন্য বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। সে নিজেই তার অকৃতজ্ঞতার সাক্ষী। মানুষ কানুদ হওয়ার সবচেয়ে বড় সাক্ষী হচ্ছে তার বিবেক। সে নিজেকেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুক যে, সে তার রবের প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা দেখিয়েছে কিনা? সে জীবনে কতবার তার রবের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে? কতবার তার প্রতি অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ করেছে?

বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতি এদের চরম মোহ

মানুষ কানুদ হওয়ার আসল কারণ হচ্ছে এটা — তার আরও চাই। যত পাই, তত চাই। সারাদিন শুধু খাই খাই। নতুন জিনিস কেনার, আরও দামি জিনিস কেনার, আরও বেশি সম্পদ জমানোর কোনো ক্ষান্ত নেই।

“অনেক হয়েছে, আর না। পুরনো গাড়িটা ফেলে দিয়ে এবার একটা নতুন গাড়ি কিনবোই। প্রতিবেশির বড় গাড়িটার পাশে আমার গাড়িটাকে একটা টেম্প্যু মনে হয়।”

একসময় আমরা অনেক কাটখড় পুড়িয়ে বাড়ি কিনি। মানুষকে গর্ব করে দেখাই নতুন কেনা দামি আসবাবপত্র, ঝকঝকে বাথরুম। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই সেই স্বপ্নের বাড়ির উপর থেকে মন উঠে যায়। বেড়াতে গিয়ে অন্যের বাড়ির আসবাবপত্র, বাথরুম দেখে আফসোস শুরু হয়। আবার হয়তবা একদিন শখের ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনি। মানুষকে বলে বেড়াই, “এবার গাড়িটা কিনেই ফেললাম। বেশি না, মাত্র ৩৫ লাখ। সস্তায় পেয়ে গেছি, কী বলেন?” তারপর কয়েক বছর না যেতেই বন্ধুর নতুন গাড়ির সামনে সেটাকে লোহালক্কড় মনে হয়। একসময় সবাইকে গর্ব করে দেখিয়ে বেড়ানো নতুন মোবাইল ফোনটা দুই বছর না যেতেই টেবিল থেকে সরিয়ে পকেটে লুকিয়ে রাখতে হয়। এত চেষ্টা করে এতসব পাওয়ার পরেও বেশিদিন প্রাপ্তির সুখ ধরে রাখা যায় না। শুরু হয় আবার প্রতিযোগিতার দৌড়।

ধর্মহীনরা বিশ্বাস করে: সম্পদ মানেই সুখ এবং সফলতা। যার যত সম্পদ, সে তত সুখে থাকবে, সে তত সফল বলে গণ্য হবে।

কিন্তু একজন মুসলিম কখনও এভাবে চিন্তা করে না। মুসলিমদের কাছে সম্পদ হচ্ছে পরীক্ষা। যত বেশি সম্পদ, তত বেশি দায়িত্ব, তত বেশি পরীক্ষা, তত বেশি জান্নাত হারিয়ে ফেলার উপলক্ষ। মুসলিমরা জানে তাদের বাড়ি, গাড়ি, জমি, একাউন্টে জমা টাকার প্রত্যেকটির হিসেব চাওয়া হবে। প্রশ্ন করা হবে: এগুলো জমিয়ে রেখেছিলাম কি শুধু নিজের সুখের জন্য, নাকি এগুলো ইসলামের জন্য কাজে লাগিয়েছি?

সম্পদের পরীক্ষায় ফেল করলে সর্বনাশ। কুর‘আনে ভয়ংকর সব শাস্তির আয়াত রয়েছে সম্পদশালীদের ঠিকমতো সম্পদ ব্যবহার না করার পরিণাম বর্ণনা করে।

এরা কি জানে না, যেদিন কবরগুলোর ভেতর থেকে সব বের করে ফেলা হবে? এদের অন্তরে কী আছে সব প্রকাশ করা হবে? সেদিন তারা দেখবে তাদের রব তাদের সম্পর্কে সবই জানেন।

কবর হচ্ছে অস্থায়ী ঠিকানা। একদিন কবর থেকে সব ছিটকে বেরিয়ে আসবে। কিছুই গোপন থাকবে না। আমরা কাকে দেখে নাক সিটকে ছিলাম, কাকে দেখে হিংসা করেছিলাম, কাকে নিয়ে বাজে চিন্তা করেছিলাম, কত কুকর্ম করার পরিকল্পনা করেছিলাম, কত অশ্লীল কাজ মনে মনে রিহার্সাল করেছিলাম —সব বের করে আনা হবে। সেদিন আমরা গিয়ে দেখবো আমাদের যাবতীয় চিন্তা, কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, কাজকর্ম সব কিছু আল্লাহ تعالى জানত l

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন